বার্ধক্যে পৌঁছালে আমাদের শরীরের হাড়গুলো ধীরে ধীরে দুর্বল ও ভঙ্গুর হতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis) বলা হয়। এই অবস্থায় সামান্য হাঁচি-কাশি দিলে, বাথরুমে সামান্য পিছলে গেলে, এমনকি বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও মেরুদণ্ডের হাড় বা কশেরুকা (Vertebra) ফেটে বা ভেঙে যেতে পারে। একে ভার্টিব্রাল কম্প্রেশন ফ্র্যাকচার (Compression Fracture) বলা হয়।
এই ফ্র্যাকচার বা হাড় ভেঙে যাওয়ার ফলে পিঠে বা কোমরে এত তীব্র ও অসহ্য ব্যথা হয় যে, প্রবীণ রোগীরা বিছানা থেকে একদম উঠতে পারেন না। সামান্য নড়াচড়া করতে গেলেও তারা ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন।
অতীতে এই সমস্যার একমাত্র সমাধান ছিল মেরুদণ্ডে বড় অস্ত্রোপচার করে রড-স্ক্রু লাগানো অথবা রোগীকে মাসের পর মাস বিছানায় শুইয়ে (Bed Rest) রাখা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী বেড রেস্টের কারণে বয়স্ক রোগীদের শরীরে বেড সোর (ঘা), নিউমোনিয়া বা রক্ত জমাট বাঁধার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়।
আজ আমরা জানবো ইন্টারভেনশনাল পেইন ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট ড. এম কে বি তানভীর (Dr. MKB Tanveer) কীভাবে কোনো বড় অপারেশন ছাড়াই, মাত্র ৩০ মিনিটের একটি আধুনিক চিকিৎসা ভার্টিব্রোপ্লাস্টি (Vertebroplasty)-র মাধ্যমে এই তীব্র ব্যথা দূর করে রোগীকে দ্রুত হাঁটিয়ে বাড়ি পাঠাচ্ছেন।
মেরুদণ্ডের হাড় ফ্র্যাকচারের প্রধান লক্ষণসমূহ
- হঠাৎ করে পিঠে বা কোমরে তীব্র এবং অসহ্য ব্যথা শুরু হওয়া।
- সোজা হয়ে দাঁড়ালে বা হাঁটলে ব্যথা বহুগুণ বেড়ে যাওয়া, কিন্তু শুয়ে থাকলে কিছুটা আরাম পাওয়া।
- বিছানায় এপাশ-ওপাশ ফিরতে বা সামান্য নড়াচড়া করতেও প্রচণ্ড কষ্ট হওয়া।
- আক্রান্ত স্থানে হাত দিলে বা চাপ দিলে তীব্র লাগা এবং আস্তে আস্তে পিঠ সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া (কুঁজো হয়ে যাওয়া)।
ভার্টিব্রোপ্লাস্টি (Vertebroplasty) কী এবং কীভাবে কাজ করে?
ভার্টিব্রোপ্লাস্টি হলো মেরুদণ্ডের হাড় ফ্র্যাকচারের একটি অত্যন্ত আধুনিক, নিরাপদ এবং বিনা অপারেশনের (Non-Surgical) বৈপ্লবিক চিকিৎসা। সহজ কথায়, এটি ভেঙে যাওয়া হাড়ের ভেতরে বিশেষ এক ধরণের ‘মেডিকেল সিমেন্ট’ ইনজেক্ট করার পদ্ধতি।
1.রোগ নির্ণয় ও লাইভ ইমেজিং:
প্রথমে এক্স-রে (X-ray) এবং এমআরআই (MRI) পরীক্ষার মাধ্যমে মেরুদণ্ডের ঠিক কোন হাড়টি এবং কতটুকু ভেঙেছে তা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত হওয়া হয়। এরপর অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে উপুড় করে শুইয়ে লাইভ এক্স-রে (C-Arm Fluoroscopy) স্ক্রিনে হাড়ের অবস্থান দেখা হয়।
2.লোকাল এনেস্থেসিয়া ও সূক্ষ্ম নিডেল প্রবেশ:
রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করার কোনো প্রয়োজন হয় না। পিঠের আক্রান্ত স্থানটি অবশ (Local Anesthesia) করে লাইভ এক্স-রে দেখে দেখে একটি বিশেষ ফাঁপা সুই (Bone Needle) নিখুঁতভাবে ভেঙে যাওয়া হাড়ের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।
3.বোনি সিমেন্ট ইনজেক্ট ও হাড় শক্ত করা:
সুইটির মাধ্যমে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে হাড়ের ফাঁকা জায়গায় ‘পলিমাইথাইল মেথাক্রাইলেট’ (PMMA) নামক একটি বিশেষ মেডিকেল বোন সিমেন্ট (Bone Cement) প্রবেশ করানো হয়। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এই সিমেন্টটি হাড়ের ভেতরে জমে শক্ত হয়ে যায়।
ওপেন সার্জারির তুলনায় ভার্টিব্রোপ্লাস্টির অতুলনীয় সুবিধাসমূহ
- বড় কোনো কাটাছেঁড়া বা সেলাই নেই: এটি সম্পূর্ণ নিডেল বা সুই-ভিত্তিক পদ্ধতি। কোনো চামড়া কাটা হয় না এবং কোনো সেলাইয়ের দাগ থাকে না।
- তাত্ক্ষণিক ব্যথা উপশম (Instant Pain Relief): সিমেন্টটি শক্ত হওয়ার সাথে সাথেই ভেঙে যাওয়া হাড়ের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রসিডিউর শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যথার তীব্রতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
- একই দিনে বাসায় ফেরা (Day Care): মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের প্রসিডিউর। চিকিৎসার পর রোগীকে ২-৩ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখে একই দিনে বাসায় ছেড়ে দেওয়া হয়। মাসের পর মাস হাসপাতালে বা বিছানায় শুয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।
- বয়স্ক রোগীদের জন্য শতভাগ নিরাপদ: যেহেতু রোগীকে পুরোপুরি অজ্ঞান করতে হয় না, তাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা থাকা প্রবীণ রোগীদের জন্যও এই চিকিৎসা অত্যন্ত নিরাপদ।
প্রবীণদের কষ্টের দিন শেষ: আজই পরামর্শ নিন
মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙার ব্যথা একজন প্রবীণ মানুষকে সম্পূর্ণ বিছানাগত ও পঙ্গু করে দিতে পারে। এই বয়সে বড় অপারেশনের ঝুঁকি না নিয়ে আধুনিক ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসার সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আমেরিকা এবং ভারত থেকে উচ্চতর ফেলোশিপপ্রাপ্ত পেইন স্পেশালিস্ট ড. এম কে বি তানভীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের রোগীদের এই বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। আপনার পরিবারের কোনো বয়স্ক সদস্য যদি এমন তীব্র পিঠ বা কোমর ব্যথায় ভুগে থাকেন, তবে অবহেলা না করে দ্রুত সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।