আমাদের দৈনন্দিন কাজের সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে হাতের ব্যবহার। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, হাতের কব্জি থেকে শুরু করে বুড়ো আঙুল, তর্জনী এবং মধ্যমা আঙুলে তীব্র ব্যথা, ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে মাঝরাতে বা ভোরের দিকে হাতের অবশ ভাব এত বাড়ে যে অনেকের ঘুম ভেঙে যায় এবং হাত ঝাঁকালে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম (Carpal Tunnel Syndrome – CTS)। আমাদের কব্জির ভেতরের একটি সরু পথ বা টানেলের মধ্য দিয়ে ‘মিডিয়ান নার্ভ’ (Median Nerve) নামক একটি প্রধান স্নায়ু হাতের তালু এবং আঙুলে প্রবেশ করে। কোনো কারণে এই টানেলের ভেতরের লিগামেন্ট মোটা হয়ে গেলে বা চাপ বাড়লে মিডিয়ান নার্ভটি চেপে যায়, যার ফলে হাত অবশ ও তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়।
যারা দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার টাইপিং করেন, মোবাইল ব্যবহার করেন, দর্জি বা সেলাইয়ের কাজ করেন এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এই সমস্যাটি বেশি দেখা দেয়। অতীতে এর প্রধান চিকিৎসা ছিল অপারেশন করে কব্জির চামড়া ও লিগামেন্ট কেটে নার্ভটিকে মুক্ত করা। কিন্তু আধুনিক ইন্টারвенশনাল পেইন ম্যানেজমেন্টের কল্যাণে এখন কোনো বড় অপারেশন ছাড়াই অত্যন্ত সফল চিকিৎসা মিডিয়ান নার্ভ হাইড্রোডিসটেনশন (Median Nerve Hydrodistension)-এর মাধ্যমে এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
আজ আমরা জানবো পেইন স্পেশালিস্ট ড. এম কে বি তানভীর (Dr. MKB Tanveer) কীভাবে এই অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে হাতের ব্যথার স্থায়ী সমাধান দিচ্ছেন।
কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম বা হাত অবশ হওয়ার প্রধান লক্ষণসমূহ
- বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী, মধ্যমা এবং অনামিকা আঙুলের অর্ধেক অংশে সুই ফোটার মতো ঝিনঝিন (Tingling) করা বা অবশ (Numbness) হয়ে যাওয়া।
- হাতের তালু ও কব্জিতে সার্বক্ষণিক চিবানো বা কামড়ানো ব্যথা থাকা, যা হাতের কব্জি ভাঁজ করলে বেড়ে যায়।
- মাঝরাতে বা ভোরের দিকে হাতের অবশ ভাব ও ব্যথার তীব্রতা অনেক বেড়ে যাওয়া।
- হাতের মুঠো দুর্বল হয়ে যাওয়া, যার ফলে চায়ের কাপ ধরা, কলম দিয়ে লেখা বা সুঁইয়ে সুতা পরাতে কষ্ট হওয়া।
মিডিয়ান নার্ভ হাইড্রোডিসটেনশন কী এবং কীভাবে কাজ করে?
হাইড্রোডিসটেনশন হলো কার্পাল টানেল সিন্ড্রোমের জন্য একটি অত্যন্ত আধুনিক, নিরাপদ এবং বিনা অপারেশনের (Non-Surgical) বৈপ্লবিক চিকিৎসা। সহজ ভাষায়, এটি তরল ওষুধের প্রেশার ব্যবহার করে চেপে থাকা নার্ভটিকে চারপাশের টিস্যু থেকে মুক্ত করার পদ্ধতি।
1.লাইভ আল্ট্রাসাউন্ড ম্যাপিং (USG Guided):
ড. তানভীর প্রথমে একটি উন্নত মাস্কুলোস্কেলিটাল (MSK) আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে কব্জির ভেতরের কার্পাল টানেল এবং চেপে থাকা মিডিয়ান নার্ভের নিখুঁত অবস্থান লাইভ স্ক্রিনে দেখে নেন।
2.স্থানটি অবশ করা (Local Anesthesia):
প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করার জন্য রোগীকে অজ্ঞান করার কোনো প্রয়োজন নেই। কব্জির নির্দিষ্ট অংশটি স্থানীয়ভাবে অবশ করে নেওয়া হয়, ফলে রোগী পুরো প্রসিডিউরে কোনো ব্যথা অনুভব করেন না।
3.নার্ভ হাইড্রোডিসটেনশন বা নার্ভ মুক্তকরণ:
লাইভ আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্রিনে সরাসরি দেখে দেখে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একটি সূক্ষ্ম নিডেল মিডিয়ান নার্ভের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বিশেষ তরল ওষুধের (Saline, Local Anesthesia এবং অতি সামান্য প্রদাহনাশক ওষুধ) একটি মিশ্রণ চাপের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। এই তরলের চাপে নার্ভের ওপর চেপে বসা চারপাশের শক্ত লিগামেন্ট বা টিস্যুগুলো আলগা হয়ে দূরে সরে যায় (Hydrodissection) এবং নার্ভটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বা মুক্ত হয়ে যায়।
ওপেন সার্জারির তুলনায় হাইড্রোডিসটেনশনের অনন্য সুবিধাসমূহ
- কোনো কাটাছেঁড়া বা সেলাই নেই: এটি সম্পূর্ণ নিডেল বা সুই-ভিত্তিক পদ্ধতি। কোনো চামড়া কাটা হয় না এবং কোনো সেলাইয়ের দাগ থাকে না।
- তাত্ক্ষণিক এবং স্থায়ী আরাম: তরল ইনজেক্ট করার সাথে সাথেই নার্ভের ওপর থেকে চাপ সরে যায়। ফলে প্রসিডিউর শেষের কয়েকদিনের মধ্যেই হাতের ঝিনঝিন ও অবশ ভাব উধাও হয়ে যায়।
- একই দিনে বাসায় ফেরা (Day Care Procedure): প্রসিডিউরটি সম্পন্ন হতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। এর পর ঘণ্টা দুয়েক বিশ্রাম নিয়ে রোগী হাসিমুখে নিজের হাতে ব্যাগ নিয়ে বাসায় চলে যেতে পারেন।
- শতভাগ নিখুঁত ও নিরাপদ: যেহেতু ড. তানভীর লাইভ আল্ট্রাসাউন্ড গাইডের মাধ্যমে সরাসরি স্ক্রিনে দেখে ওষুধ প্রয়োগ করেন, তাই নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না।
হাতের অবশ ভাবকে অবহেলা করবেন না: আজই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
হাতের নার্ভে দীর্ঘদিনের চাপ অবহেলা করলে একসময় বৃদ্ধাঙ্গুলির নিচের মাংসপেশি স্থায়ীভাবে শুকিয়ে যেতে পারে বা হাত চিরতরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই দিনের পর দিন ক্ষতিকর পেইনকিলার খেয়ে রোগ না বাড়িয়ে, ব্যথার মূল কারণটি দূর করুন।
আমেরিকা এবং ভারত থেকে উচ্চতর ফেলোশিপপ্রাপ্ত এবং মাস্কুলোস্কেলিটাল (MSK) আল্ট্রাসাউন্ডে বাংলাদেশে ১ম স্থান অর্জনকারী পেইন স্পেশালিস্ট ড. এম কে বি তানভীর উন্নত বিশ্বমানের প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের রোগীদের এই সফল চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। আপনার হাত বা আঙুল যদি অবশ হতে শুরু করে, তবে আর দেরি না করে আজই একটি সঠিক এবং আধুনিক সুচিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিন।